10/20/2026

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে দুই শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যা আটক ৩।

 


দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে দুই শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যা আটক ৩।

চিরিরবন্দরে দুই শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ ঘাতক স্বামী শাকিল হোসেন, শ্বশুর মাহতাব উদ্দিন ও শ্বাশুরী তারাবিবিকে আটক করে মরদেহ উদ্ধার করে ১৯ অক্টোবর সোমবার দুপরে ময়না তদন্তের জন্য দিমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেছে। এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর রবিবার রাত ১২ টায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মৃত গৃহবধুর স্বামী, শ্বশুর ও শ্বাশুরীকে হেফাজতে নিয়েছে। শিশু দুইটিকে হত্যা করার আলামত মিললেও গৃহবধু নিজে আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, শিশু দুইটিকে কে হত্যা করেছে এ রহস্য রবিবার দিবাগত রাত ২ টা পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় ওই মৃত গৃহবধুর পিতা খাইরুল ইসলাম ১৯ অক্টোবর সোমবার দুপুর ১২ টায় বাদি হয়ে চিরিরবন্দর থানায় ৩ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ মামলাটি রুজু করে।

এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি গত ১৮ অক্টোবর রবিবার দুপুর আড়াইটা হতে সন্ধার ঠিক পুর্ব মুহুর্তে কোন এক সময় উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জুগির ডাঙ্গা মাঠের পুর্ব পাশে মোস্তফাপুর বালু পাড়ায় ঘটেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টিসহ শোকের ছায়া নেমে এসেছে। 

দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোঃ আনোয়ার হোসেন বিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ আব্দুল হালিম, থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবী, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন, জেলা সিআইডির পুলিশ সুপার, সিআইডি পরিদর্শক, সিআইডির ক্রাইমসিন বিশেষজ্ঞগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন।

সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে শাকিল হোসেনের (২৬) সাথে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ি এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের (২০) সাথে গত সাড়ে ৩ বছর পুর্বে প্রেমের সুত্র ধরে বিয়ে হয়। ওই দম্পতির এক ছেলে সাফায়াত হোসেন (২) ও এক মেয়ে রাইফা জুরাইনা ( ৯ মাস) নামে দুটি শিশু সন্তানের মরদেহ ঘরের বিছানায় পড়ে ছিল ও স্ত্রীর মরদেহ ঘরের মেঝেতে শোয়ানো ছিল।  

স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মাদক সেবন করা নিয়ে মাঝে মধ্যে স্বামী স্ত্রীর বাকবিতন্ডাসহ টুকটাক ঝগড়া বিবাদ থাকত। সংসারের অভাব অনটনের কারনে স্বামী শাকিল অটো চালাত। অনেক রাতে  বাড়িতে ফিরত। 

স্বামী শাকিল হোসেন জানায়, দুপুরের পর অটো নিয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী বাবার বাড়ি যাওয়ার জন্য টাকার আবদার করলে, সে পরেরদিন যাওয়ার কথা জানায়। স্ত্রী খুব জেদি হওয়ায় তাকে কিছু না বলে অটো নিয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে যায়। সন্ধায় বাড়ি ফিরে অনেক ডাকাডাকি করে ঘরের দরজা না খোলায় দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে  আফছায়া আলোয় স্ত্রীকে ঝুলন্ত ও সন্তান দুটোকে মরে পড়ে থাকতে দেখি। 

মৃত গৃহবধুর শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন জানায়, অন্যের বাড়িতে মজুরের কাজ শেষে সন্ধার পরপরই বাড়িতে ফিরে ভাত খাওয়ার সময় ছেলের বউ, নাতী নাতনী কারো কোন সাঁড়া না পাওয়ায় অনেক ডাকাডাকি করেও দরজা না খোলায় বাড়ির মধ্য বরাবর টিনের বেড়া ভেঙ্গে ছেলের ঘরের দরজা খুলে বউমার মরদেহ নামিয়ে আনি। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশিরা এগিয়ে আসে ও আমার স্ত্রী নাতী নাতনী দুটোকে কোলে নিয়ে কান্না শুরু করে। 

ওই মৃত গৃহবধুর মা আনজু আরা বলেন, তার জামাই শাকিল তাদের ফোনে জানায়, তাদের মেয়ে সন্তানগুলোকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করেছে। সংবাদ পেয়ে দ্রুত জামাইয়ের বাড়িতে আসি। তবে ৩ মাস পুর্বে মেয়ে জানিয়েছিল, জামাই নেশা করে। 

মৃত গৃহবধুর আপন বড় ভাই ও শাকিলের আপন ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, আমি বিয়ের পর হতে ৬ বছর এই বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া ঘরে থাকতাম। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটিতে এসে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার এই বাড়িতেই ছিলাম। বোন আত্মহত্যা করেছে নাকি স্বামী মেরে ফেলেছে, ঘটনাটি বুঝতে পারছিনা।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আমিন শাহ বলেন, তাদের পারিবারিক কলহ ছিলনা। কেউ কোনদিন অভিযোগ দেয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, বোঝা যাচ্ছেনা। প্রশাসন এসেছে, তারা তদন্ত করছে। ঘরের দেয়ালে কিছু লেখা ছিল, লেখাগুলি কে লিখেছে, জানা যাচ্ছে না। তবে লেখা ছিল আজ থেকে এ গল্প শেষ। আমি অভাগি মা। আমার সন্তানদের নিজে মারছি। সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। লাশ পলাশবাড়িতে মাটি দেন। শাকিল যেন না ছোয়, বাবা মা সরি। আই লাভ ইউ চিহ্ন ছিল। 

ঘটনাস্থলে জেলা পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা পিপিএম বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য বা মোটিভ উদ্ধার করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ শুরু করেছে। 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা। আমরা আলামত সংগ্রহ করেছি, সুরতহাল করেছি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গৃহবধুর স্বামী শাকিল হোসেন (২৬), শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন (৫০) ও শ্বাশুরী রহমত আলা তারাবিবি (৪২) কে হেফাজতে নিয়েছি। মরদেহগুলোর ময়না তদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যাবে। 

থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবী বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছাই। এলাকাবাসি ক্রাইমস্পটে অনেক ভীড় করে ছিল। দ্রুত এলাকাটি ফাঁকা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষকে অবহিত করি। রাত প্রায় সাড়ে ১২ টার দিকে সিআইডির ক্রাইম বিশেষজ্ঞ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এরপর মরদেহ গুলো উদ্ধার করে থানায় নেয়া হয়। এ ঘটনায় ওই গৃহবধুর পিতা ১৯ অক্টোবর সোমবার দুপুরে বাদি হয়ে থানায় একটি এজাহার দায়ের করলে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। ঘটনার রাতে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বামী শাকিল নিজেই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে অধিকতর তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।


শেয়ার করুন

Author:

দেশ ২৪ নিউজ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। আমরা আইনীভাবে বাংলার খবর শেয়ার করছি। আমরা বর্তমানের খবরের সাথে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।

0 coment rios: